সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপে প্রথম যাই ১৯৮৬ তে। যাই দেখি তাতেই মুগ্ধ।
সেসময় ভেনেজুয়েলার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সিনিয়র প্রফেসর বশির উল্লাহ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক), তিনি দেখি যাই দেখেন তাতেই হতাশ ও বিরক্ত। ভয়ে ভয়ে জানতে চাইলাম, স্যার আপনার এই হতাশার কারণ কি? তিনি জানালেন, ৫০/৬০ এর দশকে তিনি বহুবার এই দ্বীপে এসেছেন, সে সময়ের তুলনায় ৮৬তে দ্বীপটির মৃতপ্রায় অবস্থা দেখে তিনি খুবই মর্মাহত। তাঁর ভাষায় এককালের 'প্যারাডাইজ'টির যে এই হাল করতে পারে কোন একটি দেশ ও তার মানুষেরা, এতে তিনি বিপন্ন বোধ করছিলেন।

১৯৮৬র পর আমারও বেশ কবার যাওয়া হয়েছে দ্বীপটিতে, কয়েক বছর পরপর, প্রায় নিয়মিত বিরতিতে। সবশেষ বার যাই ২০০৬-এ। এবার আমার বিপন্ন বোধ করার পালা। ১৯৮৬ তে যা দেখেছি, তার প্রায় কিছুই এখন আর অবশিষ্ট নেই।


প্রতিদিন সকাল ১০-১১র মধ্যে তিন ফেরী বোঝাই ৮০০-১০০০ পর্যটক নামেন দ্বীপটিতে।
অল্প সংখ্যক রাত্রিযাপন করেন, বাকিরা ফিরতি ফেরীতে আবার ফিরে যান বিকেল নাগাদ। হাতে সময় থাকে কয়েকঘন্টা, খাবার দাবারের সময় বাদ দিলে খুবই সামান্য সময় দ্বীপটিকে দেখার জন্য, বোঝার জন্য। তবু তারা আসেন, সাথে নিয়ে আসেন নগরজীবনের প্রাত্যাহিক স্বার্থপরতাকে, প্রতিবেশীকে জানতে-বুঝতে না চাইবার প্রবণতাকে, অর্থের বিনিময়ে সব কিছু নিজের মনে করার অভ্যাসকে।
তারপর ৩/৪ ঘন্টায় ভঙ্গুর দ্বিপটির ওপর চলে একরকমের অত্যাচার, যা সইবার মত, বইবার মত ক্ষমতা তার নেই।

মানুষের অত্যাচারে প্রায় বিলীন হয়ে গেছে অনেক প্রজাতির কাকড়া, একটি ছোট্ট বীচে ৮০০ মানুষ প্রতিদিন দাপাদাপি করলে তাদের আর বেঁচে থাকা সম্ভব? বিলীন হয়েছে অনেক প্রজাতির অদ্ভুৎ সুন্দর সব শামুক ঝিনুক, সমুদ্রের শশা বলে পরিচিত প্রাণিটি প্রায় বিলীন হবার পথে, নুতন করে অয়েস্টারের বংশবিস্তার বলতে গেলে হচ্ছেইনা, লিমপেট দেখেছি খুব কম, বার্ণাকলও নুতন কলোনি করছে বলে মনে হোল না, স্টারফিশ খুবই কম দেখা যাচ্ছে, সী অরচিনের দেখাও প্রায় মেলে না, পাথরের খাঁজে ব্রেন কোরাল দেখা যাবে তাতো আর আশাই করিনা - ওরা স্থান নিয়েছে সৌখিন মানুষের ড্রইং রুমে, ছেড়াদ্বীপের (চিরাদিয়া) অসম্ভব সুন্দর নিঃসর্গ আজ আর নেই। হাজার হাজার বছর ধরে জমা হওয়া দ্বীপটির প্রাকৃতিক ইতিহাসের সাক্ষী শামুকের আস্তরণগুলো অবুঝ মানুষ চোখের সামনে খুচিয়ে খুচিয়ে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন। প্রবালের প্রেম এতই বেশি পর্যটকদের যে ওদের বাঁচিয়ে রাখার চাইতে নিজের বাড়ীতে সাজিয়ে রাখার আগ্রহই বেশি।
আর আপনি শিক্ষিত হয়ে আগ্রহ দেখালে, অ
শিক্ষিত স্থানীয়রা দুটো পয়সা পাবার জন্য ওদের মারতেই থাকবে, মারতেই থাকবে।

সরকার কিছু বছর আগে দ্বীপটিকে পরিবেশগতভাবে বিপন্ন ও স্পর্শকাতর অঞ্চল হিসাবে ঘোষনা করেছে, কিন্তু অসুস্থ পর্যটন সেখানে বন্ধ হয়নি। গ্রামীন ফোনের বার্ষিক সম্মেলন কেন ওখানে হতে হবে আমার মাথায় আসে না। হুমায়ুন আহমেদের কেন ওখানেই বাড়ী কিনতে হবে আমার মাথায় আসে না, আপনি নাকি খুব মমতাময় লেখক, ফুল সুন্দর হলেই তা আপনার ছিড়ে নিয়ে আসতে হবে? আপনিতো বিজ্ঞানেও মাথাঅলা, আপনি পরিবেশের স্পর্শকাতরতা বোঝেন না?

প্রিয় ব্লগার ও পাঠক, প্লীজ আপনারা এভাবে সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপে যাবেন না। আমাদের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটিকে যদি বাচাতে চান-
১। কাউকে সেখানে যাবার উৎসাহ দেবেন না
২। সেখান থেকে যে কোন রকম প্রাণী-উদ্ভিদ সংগ্রহ করা থেকে সবাইকে বিরত রাখুন
৩। ছেড়া দ্বীপে স্নর্কলিং করবেন না
৪। নৌকা নিয়ে প্রবাল রীফে যাবেন না
৫। বীচে দাপাদাপি করবেন না
৬। কাছিমের ডিম পাড়া দেখার জন্য যাবেন না, জীবনে বহু কিছুই দেখেন নি, এটি না দেখলেও আপনার জীবন বৃথা হয়ে যাবেনা
৭। কক্সবাজার থেকে প্রবাল কিনবেন না, এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সেন্ট মার্টিন্স থেকে সংগৃহিত
৮। সুন্দরবন, হাকালুকি হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, লাওয়াছড়ি এসব স্থানে বেড়াতে গেলেও আপনার পরিবেশগত সচেতনার পরিচয় দিন। আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সম্পদগুলো আপনার সহায়তা পেলেই আবার বাঁচবে। আপনি লোভী হলে, স্বার্থপর হলে তারা মরবে। আপনার সন্তানের দেখার জন্য কিছুই আর থাকবে না।

0 comments:

Post a Comment