পূর্ববর্তী পর্বসমূহ:
শখের ছবিয়ালের টিপস-০১
শখের ছবিয়ালের টিপস-০২

গত পর্বে সংক্ষেপে বলেছিলাম ক্যামেরা কিভাবে এক্সপোজার নিয়ন্ত্রন করে এবং ফোকাস নিবদ্ধ করে। এবার এ নিয়ে একটু বিস্তারিত। যদি এ পর্বে এসে ভাবতে শুরু করেন এই তত্ত্বগুলোর কী প্রয়োজন, কেন আমি সরাসরি কিছু টিপস দিতে শুরু করছিনা, তার উত্তরে আমি বলবো 'এ জিনিসগুলো বোঝার দরকার আছে আমার সত্যিকারের টিপসগুলো বোঝার জন্য'। আমি যথাসম্ভব টেকনিক্যাল বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা সরল রাখতে চেষ্টা করছি ।

এক্সপোজার:

আগের পর্বে বলেছিলাম শুট বাটনটি অর্ধেক চেপে ধরলে দৃশ্যের আলোর পরিমান বুঝে ক্যামেরা সঠিক এক্সপোজার নির্ধারণ করে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই আপনি যে দৃশ্যের ছবি তুলছেন তার সব অংশে আলোর পরিমান বা উজ্জ্বলতা সমান নয় - কোন অংশ রোদ, কোন অংশে ছায়া, আবার কোন অংশে উজ্জ্বল রং, কোন অংশে গাঢ় রং। এরকম আলোক ভিন্নতার একটি উদাহরণ হলো আকাশ ও দুরের বন/পাহাড় - আকাশের অংশ অনেক বেশি উজ্জ্বল, নিচে বন/পাহাড় অনেকটাই অন্ধকার। এরকম ভিন্ন ভিন্ন উজ্জ্বলতার অংশ যদি দৃশ্যে থাকে ক্যামেরা কোন অংশের জন্য সঠিক এক্সপোজার নির্ধারণ করবে? যদি উজ্জ্বল অংশের জন্য সঠিক এক্সপোজার নির্ধারণ করতে হয়, তাহলে গাঢ় অংশ অন্ধকার আসবে; আবার গাঢ় অংশের জন্য এক্সপোজার নির্ধারণ করলে উজ্জ্বল অংশ বেশি উজ্জ্বল হয়ে প্রায় জ্বলে যাবে। প্রায়ই আপনারা ছবিতে দেখেন যে আকাশ নীল না এসে সাদা হয়ে যায়, এটা আকাশের অতিরিক্ত এক্সপোজারের জন্যই হয়ে থাকে।

দৃশ্যের কোন অংশ কতটুকু উজ্জ্বল তা বোঝার জন্য ক্যামেরাকে বিভিন্ন অংশ থেকে আসা আলোর তীব্রতা মাপতে হয়। এই মাপার কাজটিকে বলে মিটারিং। প্রায় সব ডিজিটাল ক্যামেরার ক্ষেত্রেই যে পদ্ধতিতে ক্যামেরা মিটারিং করে থাকে তাকে বলে ম্যাট্রিক্স মিটারিং। এর অর্থ হলো দৃশ্যের বিভিন্ন অংশ থেকে যে আলো আসে তা আলাদা আলাদাভাবে ক্যামেরা মেপে নেয়। এরপর ক্যামেরার সফটওয়্যার দৃশ্যের গড় উজ্জ্বলতা থেকে এক্সপোজারের সিদ্ধান্ত নেয়। গড় বলতে যে সবসময় গাণিতিক গড় হবে এমন কোন কথা নেই। এক এক ব্রান্ডের ক্যামেরার এক এক রকমের গড় হিসাব করার পদ্ধতি আছে, সবাই চায় তাদের ক্যামেরা যেন সবচেয়ে বুদ্ধিমত্বার সাথে গড়টি হিসাব করতে পারে, ফলে সবচেয়ে ভালো ছবি আসে। এবং প্রস্তুতকারকরা এই অ্যালগরিদমগুলো সাধারণত প্রকাশ করে না, তাই নিশ্চিতভাবে কোন ক্যামেরা কিভাবে গড় বের করে তা আমরা জানি না। সুখের কথা অ্যালগরিদমটি আমাদের না জানলেও চলবে, শুধু জানতে হবে মিটারিংয়ে কোন প্রকার ভেরিয়েশন ক্যামেরা আমাদের পছন্দ করতে দেয় কিনা। সব সস্তা ক্যামেরা দেয় না, তবে কোন কোন ক্যামেরা কয়েকরকম মিটারিং মোড সেট করতে দেয় - ইভ্যালুয়েটিভ বা ইন্টেলিজেন্ট মিটারিং, সেন্টার ওয়েটেড অ্যাভারেজ মিটারিং, স্পট মিটারিং ইত্যাদি।

* ইভ্যালুয়েটিভ বা ইন্টেলিজেন্ট মিটারিং: এই মিটারিংয়ে দৃশ্যের সব অংশের আলোর তীব্রতাকে বিবেচনায় এনে ক্যামেরা একটি এক্সপোজার নির্ধারণ করে;

* সেন্টার ওয়েটেড অ্যাভারেজ মিটারিং: এই মিটারিংয়ে দৃশ্যের মাঝামাঝি অংশের উপর বেশি জোর দেয়া হয়, অর্থাৎ ক্যামেরা চায় মাঝের অংশের এক্সপোজার যথাসম্ভব সঠিক থাকুক, ছবির চারপাশের অংশগুলোর এক্সপোজার ততটা সঠিক না হলেও চলবে;

* স্পট মিটারিং: স্পট মিটারিংয়ে দৃশ্যের একেবারে কেন্দ্রে যা থাকবে তার উপর ভিত্তি করে এক্সপোজার নির্ধারিত হবে, তাতে ছবির বাকি সব অংশের এক্সপোজার যাই হবে হোক (ওভার বা আন্ডার)।

বাদবাকি ক্যামেরা ব্যবহারকারীর সিদ্ধান্ত তিনি পুরো দৃশ্য সমান গুরুত্ব দিয়ে এক্সপোজ করতে চান নাকি শুধু মাঝখানের কিছু অংশকে প্রাধান্য দিতে চান, নাকি শুধু কেন্দ্রকেই বিবেচনায় আনতে চান। এই সিদ্ধান্ত নির্ভর করে আপনি কিসের ছবি তুলছেন, বাস্তবিক কতটা তারতম্য আছে বিভিন্ন অংশের উজ্জ্বলতার - এসব বিষয়ের উপর। এই তত্ত্বটির ব্যবহারিক প্রয়োগ করা খুব সহজ নয়, তবে জানা থাকলে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নিজেই শিখে ফেলা যায় কোন পরিস্থিতিতে কী করতে হবে।

ফোকাস:

এ ব্যাপারে আগের পর্বে বলেছিলাম ক্যামেরা অটোফোকাসের সাহায্যে নিজেই দৃশ্যের জিনিসগুলোর উপর ফোকাস নিবদ্ধ করে। যদি সব বস্তু সমান দুরত্বে হয়, ব্যাপারটি খুব সহজ, সেই দুরত্বে ফোকাস করলেই হয়। কিন্তু কোন জিনিস কাছে, কোন জিনিস দূরে হলে ক্যামেরা চেষ্টা করে দুটোকেই ফোকাসে আনতে। কাছে দূরে
সমানভাবে ফোকাস করা কি সম্ভব? উত্তর হ্যা এবং না। 'না' এই জন্য যে, সাধারণ নিয়ম হলো, কাছে ফোকাস করলে দূরের জিনিস ঝাপসা হয়ে যাবে, দূরে ফোকাস করলে কাছের জিনিস ঝাপসা হয়ে যাবে। আবার উত্তর 'হ্যা' এই জন্য যে, তা নির্ভর করে
কয়েকটি বিষয়ের উপর -

১। মূল ফোকাসকৃত বস্তুটি ক্যামেরা থেকে কত দূরে (ফোকাল ডিসট্যান্স)
২। 'কাছে' এবং 'দূরে'-র বস্তুর মধ্যে দূরত্ব কতটা (ডেপথ)
৩। লেন্সের অ্যাপার্চার কত।

যতটা দূরত্বের মধ্যে সব বস্তুই ফোকাসে থাকে তাকে ডেপথ-অব-ফিল্ড বলে। এই ডেপথ-অব-ফিল্ড স্থির নয়, কমে বাড়ে। যদি দুটি বস্তুর দূরত্ব ক্যামেরার ডেপথ-অব-ফিল্ড -এর চেয়ে কম হয় তাহলে উভয় বস্তুই ফোকাসে আনা সম্ভব। এই বিষয়ক আরেকটু আলোচনা করতে পারলে ভালো হতো, তবে নিরস হয়ে যাবে মনে করে আপাতত বাদ দিয়ে গেলাম, পরে কখনো প্রয়োজন মনে করলে লিখতেও পারি।

আপনার দৃশ্যে ক্যামেরা যখন দেখবে বস্তুগুলো কাছে-দূরে আছে, তখন ক্যামেরা নিচের দুটির যে কোন একটি কাজ করবে -

১। ডেপথ-অব-ফিল্ড বাড়িয়ে সবগুলোকে
ফোকাসে আনার চেষ্টা করবে। সেটা করা সম্ভব লেন্সের পর্দার ছিদ্রটি (অ্যাপার্চার) ছোট করে (বড় f সংখ্যা)। অ্যাপার্চার কমালে আলো কমে যাবে, তাই আলো ঠিক রাখার জন্য একই সাথে ক্যামেরা এক্সপোজার টাইম বাড়িয়ে দেবে (শাটার স্পীড কম)। ISO যদি Auto-তে থাকে ISO speed বাড়িয়েও কমে যাওয়া এক্সপোজারকে ঠিক করতে পারে ক্যামেরা।

২। প্রথম প্রক্রিয়াটি যদি সফল না হয় (প্রধানত লেন্সের সীমাবদ্ধতার কারণে), তখন
ক্যামেরা যে কোন একটি বস্তুকে ফোকাসে এনে অন্যটিকে ফোকাসের বাইরে রাখবে। এই সিদ্ধান্তটি আপনার পক্ষে নেয়া যত সহজ, ক্যামেরার পক্ষে সহজ নয়; কারণ আপনি জানেন দৃশ্যের কোন জিনিসটি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, ক্যামেরার জানার কথা নয়। তবু আজকালকার ক্যামেরাগুলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করে কোন জিনিসটি কী - কোনটি মানুষ, কোনটি ফুল, কোনটি আপাতদৃষ্টিতে অনুল্লেখ্য বা সাবজেক্ট হিসাবে কম গুরুত্বপূর্ণ।

অনেক ক্যামেরা আছে বাটনটি অর্ধেক চাপলে দৃশ্যের কোথায় কোথায় ফোকাস করার চেষ্টা করছে তা আপনাকে দেখাবে। যদি আপনার সেসব মনপুত না হয়, একটু ভিন্ন দুরত্ব বা ভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে আবার ফোকাস করার চেষ্টা করুন। অনেক ক্যামেরায় ফেস ডিটেকশন প্রযুক্তি আছে, দৃশ্যে যেখানেই মানুষের চেহারা দেখা যাবে সেখানেই ক্যামেরা ফোকাস করার চেষ্টা করবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্যামেরার পছন্দ আপনার পছন্দের সাথে মিলে যাবে, তবে এমনও পরিস্থিতি হয় যখন আপনি যে জিনিসটি ফোকাস করতে চাইছেন, ক্যামেরা কিছুতেই সেই জিনিসটি ফোকাস করছে না। তখন ক্যামেরাকে 'বোকা বানিয়ে' ফেলতে হয়, অর্থাৎ ক্যামেরার এই স্মার্ট বা ইন্টেলিজেন্ট অপশানটি বন্ধ করে দিতে হয় (সব ক্যামেরায় বন্ধ করা নাও যেতে পারে)। ইন্টেলিজেন্ট অটোফোকাস বন্ধ করে দিলে ক্যামেরা শুধুমাত্র দৃশ্যের কেন্দ্রে যা আছে তাকেই ফোকাস করে (সেন্টার ফোকাসিং)। এবার আপনি যে জিনিসটি ফোকাস করতে চান তাকে ভিউ-র ঠিক কেন্দ্রে এনে বাটনটি অর্ধেক চাপুন, এভাবে আপনার কাঙ্খিত জিনিসটির উপর ফোকাস নিবদ্ধ হবে।

লক:

এখন সমস্যা হলো আপনার কাঙ্খিত বস্তুটি সবসময় ছবির কেন্দ্রে থাকুক এটা আপনি চাইবেন না, এমনকি ভালো কম্পোজিশনের জন্য মূল সাবজেক্টকে অফ-সেন্টার রাখার কথা বলা হয় (রুল অব থার্ড)। আবার লক্ষবস্তুকে অফ-সেন্টারে রাখলে অন্য কিছু চলে আসবে কেন্দ্রে, ও ফোকাসে। এই সমস্যা থেকে পরিত্রানের জন্য আমার জানামতো সব ক্যামেরাতেই একটি বিশেষ ব্যবস্থা আছে, তার নাম ফোকাস ও এক্সপোজার লক। আপনি যখন বাটনটি অর্ধেক চাপেন তখন শুধু যে ফোকাস ও এক্সপোজার নির্ধারিত হয় তাই নয়, বাটনটি ছেড়ে না দেয়া পর্যন্ত যে ফোকাস ও এক্সপোজার নির্ধারিত হয়েছে তা অপরিবর্তিত (লক্‌ড) থাকে। কাজেই লক্ষ্যবস্তুকে কেন্দ্রে রেখে বাটনটি অর্ধেক চেপে ফোকাস করুন, এবং বাটনটিকে অর্ধেক চেপে রেখেই ক্যামেরার মুখ সামান্য ঘুরিয়ে বস্তুটিকে অফ-সেন্টারে (ছবির ফ্রেমে আপনার কাঙ্খিত অবস্থানে) নিয়ে আসুন, এবার বাটনটি পুরো চেপে দিয়ে ছবিটি তুলে ফেলুন। এই পুরো প্রক্রিয়ায় একবারও বাটনটি ছেড়ে দেবেন না, দিলেই ফোকাস ও এক্সপোজার নড়ে যাবে।

Read more



[প্রথম পর্বে আপনাদের আগ্রহ ছিলো আশাতীত। সেখানে করা আপনাদের মন্তব্য, বিশেষ করে পরামর্শ ও চাহিদামূলক মন্তব্যগুলো গুরুত্ব দিয়েই নিয়েছি, এবং পরের পর্বগুলোতে আপনাদের পরামর্শ ও চাহিদার যথাসম্ভব প্রতিফলন দেখতে পাবেন আশা করি। আন্তরিক ধন্যবাদ সবাইকে।]
[আগের পর্বের মন্তব্যগুলোর জবাব এখনো দেয়া হয়নি আরো কয়েকটি পর্বের পরিকল্পনা করতে গিয়ে, সময় করে দিয়ে দেব, আশা করি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন]

প্রথম পর্ব: শখের ছবিয়ালের টিপস-০১

আপনার ক্যামেরাকে জানুন:

আপনার ক্যামেরাটিকে জানার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তার ম্যানুয়াল (ইউজার গাইড) ভালো করে স্টাডী করা। যদি কারো ম্যানুয়াল না থাকে, বা হারিয়ে গিয়ে থাকে, ইন্টারনেট থেকে pdf ভার্সন নামিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে পারেন গুগলে সার্চ দিয়ে। কিছু ব্রান্ডের ক্যামেরার ম্যানুয়াল কোথায় কোথায় পাবেন তার একটি লিংক তালিকাও নিচে দিলাম-

ক্যানন
নাইকন
সনি
অলিম্পাস
কোডাক
ক্যাসিও
কনিকা মিনোল্টা
এপসন

এর পর যা জানা দরকার, এমনকি ম্যানুয়াল/ইউজার্স গাইড পড়ে বোঝার জন্যও যা জানা দরকার-

কিভাবে ডিজিটাল ক্যামেরা কাজ করে:

এখানে আমি ডিজিটাল ক্যামেরার ফিজিক্স বা মেকানিক্স (কিভাবে কাজ করে তা) আলোচনা করতে চাইনা, বরং আপনি যখন ক্যামেরাটি ব্যবহার করেন তখন ক্যামেরার অপারেশন্স (কী কাজ করে তা) বলতে চাই সংক্ষেপে। কী কাজ করে তা বোঝার জন্য আপনার দুটি ব্যাপার জানা দরকার - এক্সপোজার ও ফোকাস।

১। এক্সপোজার

আপনারা জানেন দৃশ্যের বস্তুগুলোর উপর আলো পড়লে আমরা তা দেখতে পাই বস্তু থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসে বলে। একই কারণেই ক্যামেরার লেন্সও তা দেখতে পায়। লেন্সের ভেতর দিয়ে যে আলো প্রবেশ করে তা ক্যামেরার সেন্সরে (এবং ফিল্মে) ছবি হিসাবে রূপ পায়। আলো বেশি হলে দৃশ্যটি উজ্জ্বল হবে, আলো কম হলে অন্ধকার হবে। কিন্তু আমরা বেশি উজ্জ্বল (জ্বলে যাওয়া) ছবিও চাইনা, অন্ধকারমতো ছবিও চাইনা - আমরা চাই মাঝামাঝি (সঠিক উজ্জ্বলতার) ছবি। এ কাজটি করে থাকে ক্যামেরার এক্সপোজার কন্ট্রোল সিস্টেম। বাইরে আলো বেশি হলে ক্যামেরা তা কমিয়ে নেয়, আলো কম থাকলে তা বাড়িয়ে নেয়। ক্যামেরা দু'ভাবে এই কাজটি করে থাকে-

১.ক) শাটার স্পীড

কতক্ষণ সময় ক্যামেরার লেন্সের ভেতর দিয়ে আলো ঢুকবে তা নির্ধারণ করে শাটার স্পীড। বুঝতেই পারছেন ১ সেকেন্ডে যে পরিমান আলো ঢুকবে, ২ সেকেন্ডে তার দ্বিগুন পরিমান আলো ঢুকবে। স্বাভাবিক সময় ক্যামেরার লেন্স সবসময় বন্ধই থাকে একটি পর্দা বা ডায়াফ্রাম দিয়ে, যখন আপনি ছবি তোলার বাটনটি চাপেন তখনই অল্প সময়ের জন্য পর্দাটি খুলে গিয়ে আবার বন্ধ হয়ে যায়। আমরা সেই খোলা-বন্ধ হবার মৃদু ক্লিক শব্দও শুনতে পাই। (ডিজিটাল ক্যামেরা টেকনোলজিতে এই পর্দাটি থাকবেই এমন নাও হতে পারে, বিশেষ করে মোবাইল ফোন ক্যামেরায়, পর্দার কাজটি ডিজিটালীও নিয়ন্ত্রন করা যেতে পারে)। সাধারণত আলো ঢোকানোর এই কাজটি খুব অল্প সময় হয়ে থাকে, ঝকঝকা রোদে কোন কিছুর ছবি তুললে সময়টি ১ সেকেন্ডের ৫০০ বা ১০০০ ভাগের একভাগ মাত্র; কিন্তু একই জিনিসের ছবি গাঢ় ছায়াতে তুললে ১ সেকেন্ডর ৬০ বা ১২৫ ভাগের একভাগ সময়, অর্থাৎ প্রায় তিনগুন বেশি সময় আলো ঢোকাবে ক্যামেরার এক্সপোজার কন্ট্রোল সিস্টেম। এভাবে দৃশ্যের আলো কম থাকলে সময় বাড়িয়ে এবং দৃশ্যের আলো বেশি থাকলে সময় কমিয়ে ক্যামেরা সঠিক পরিমান আলো প্রবেশের ব্যবস্থা করে থাকে।

টীকা ১: উপরে যে এক সেকেন্ডের ৬০, ১২৫, ৫০০, ১০০০ ভাগের এক ভাগ সময় উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করেছি এটাকে ফটোগ্রাফী তে ১/৬০, ১/১২৫.... অথবা শুধু ৬০, ১২৫ হিসাবে উল্লেখ করা হয়। শাটার স্পীড ৩০ বললে বুঝবো ১/৩০ সেকেন্ড।

টীকা ২: অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শাটার স্পীড ৬০-র নীচে চলে গেলে ক্যামেরা হাতে রেখে ছবি তোলা নিরাপদ নয়, ছবি ঝাপসা (ব্লারড) হবে, সেক্ষেত্রে ট্রাইপড বা অন্য নিশ্চল জিনিসের উপর ক্যামেরা রেখে ছবি তোলা উচিত। তবে যার ছবি তুলছেন সে জিনিসটি যদি নড়তে থাকে, তাহলে কিছুই করার নেই।

১.খ) অ্যাপার্চার

শাটার স্পীড ছাড়াও আর যে পদ্ধতিতে আলোর পরিমান নিয়ন্ত্রন করা হয় তার নাম অ্যাপার্চার। উপরে যে পর্দাটির কথা বলেছি তা এমনভাবে তৈরী যে তার ছিদ্রমুখটি (অ্যাপার্চার) চোখের তারার মতই বড় ছোট করা যায়। তীব্র আলোয় যেমন আমাদের চোখের মনি ছোট হয়ে যায়, কম আলোয় বড় হয়ে যায়; ঠিক একই ভাবে আলোর তারতম্য বুঝে ক্যামেরার অ্যাপার্চার ছোট বড় হয়। এভাবেও ক্যামেরা সঠিক পরিমান আলোর প্রবেশ নিয়ন্ত্রন করে থাকে।

টীকা: অ্যাপার্চার নির্দেশ করা হয় একটি অনুপাত দিয়ে, যেমন: ১:২.৮ বা f/2.8 হিসাবে, তবে বলার সময় শুধু সংখাটিই সাধারণত উল্লেখ করা হয় (২.৮)। ডিজিটাল ক্যামেরায় অ্যাপার্চার নির্দেশক সংখ্যাটি যে কোন কিছু হতে পারে, তবে সাধারণত অ্যাপার্চার ১.৪, ২, ২.৮, ৪, ৫.৬, ৮, ১১, ১৬, ২২ এরকম হয়ে থাকে। সংখ্যাটি যত ছোট পর্দার ছিদ্রটি তত বড় ও তত বেশি আলো প্রবেশ করবে, সংখ্যাটি যত বড় ছিদ্র তত ছোট ও কম আলো প্রবেশ করবে।

১.গ) প্রকৃতপক্ষে সকল ক্যামেরাই শাটার স্পীড ও অ্যাপার্চার এর যে কোন একটি নয়, বরং দুটোর সমন্বয় করেই আলোর পরিমান নিয়ন্ত্রন করে থাকে।

২। ফোকাস

যে জিনিসের ছবি তুলছেন তা যদি সঠিকভাবে ফোকাস হয়ে থাকে তবেই শার্প ছবি পাবেন, নয়তো ছবি ঝাপসা (আউট-অব-ফোকাস) দেখাবে। আজকাল সকল ডিজিটাল ক্যামেরাই অটোফোকাস, অর্থাৎ নিজে নিজেই দৃশ্যের বস্তুগুলোর দুরত্ব হিসাব করে সেগুলোকে ফোকাসে নিয়ে আসতে পারে। সঠিক ফোকাসে আনার জন্য লেন্সের ভিতর ইলিমেন্টগুলোকে অবস্থান বদল করতে হয়। সাধারণত কাছের জিনিসকে ফোকাসে আনলে দূরের জিনিস ঝাপসা হবে, দূরের জিনিসকে ফোকাসে আনলে কাছের জিনিস ঝাপসা হয়ে যাবে।


এ পর্যন্ত জানার পর আবার শুরুর কথায় ফিরে যাই, আপনি যখন ছবি তোলেন ক্যামেরা তখন কী করে? এক. আলোর পরিমান অনুযায়ী শাটার স্পীড ও অ্যাপার্চার পরিবর্তন করে সঠিক এক্সপোজার নির্ধারণ করে, দুই. লেন্সের সামনে যা কিছু আছে সেগুলোর উপর ফোকাস নিবদ্ধ করে। ফোকাস নিবদ্ধ করার কাজটি সহজ হয় যদি সব বস্তু সমান দূরে থাকে। কিন্তু সব বস্তু যদি সমান দূরে না থেকে কাছে দূরে থাকে, তাহলে ক্যামেরা কোনটাকে ফোকাসে আনবে? এটা নির্ভর করবে আপনি ক্যামেরাকে কোন মোডে রেখেছেন তার উপর (এ নিয়ে আরেকটি পর্ব লিখতে হবে, তাই আজকে বাদ দিয়ে যাচ্ছি)।

এই দুটো কাজ করার জন্য একটু হলেও ক্যামেরার সময় দরকার, বিশেষ করে ফোকাস করার জন্য (যেহেতু ক্যামেরা লেন্সের ভিতর কিছু ম্যাকানিক্যাল কাজ করার দরকার হয়)। এই সময়টুকু ক্যামেরাকে আপনার দিতে হবে। তাই বেশিরভাগ (আমার জানামত প্রায় সব ডিজিটাল) ক্যামেরায় শাটার বাটনটির দুটি কাজ। বাটনটিকে অর্ধেক চেপে ধরলে ফোকাস ও এক্সপোজার নির্ধারিত হয়, এরপর পুরো চেপে দিলে ছবি তোলার কাজটি শেষ হয়। আপনি যদি প্রথমবারেই বাটনটি পুরো চেপে ধরেন, হয় ক্যামেরা ছবিটি তুলবে না কারণ তার প্রাথমিক কাজ বাকী আছে; অথবা কোন কোন ক্যামেরা এমনও থাকতে পারে যে ভুলভাল এক্সপোজার ও ফোকাস দিয়েই একটি ছবি তুলে ফেলবে। তাই ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবি তুলতে সবসময়ই ২/৩ সেকেন্ড সময় বাটনটি অর্ধেক চেপে ধরে ক্যামেরাকে সব ঠিক করে নিতে দেবেন, এটা শেষ হলে অনেক ক্যামেরাই আপনাকে একটি সবুজ সংকেত দেবে বাটনটি পুরো চাপার, তখনই কেবল ছবিটি তুলুন।

Read more


[আজকাল প্রায় সবারই ডিজিটাল ক্যামেরা বা ফোন ক্যামেরা আছে, এবং সবাই ছবি তোলেনও। কিছু ছোটখাট জিনিস জানা থাকলে ছবিগুলো যতটুকু তুলছেন তারচেয়ে ভালো হতে পারে। তাই সবার জন্য ছবি তোলার টিপস দিয়ে শুরু করলাম এই লেখাটি। টিপসগুলোয় ডিএসএলআর-কে যথাসম্ভব পরিহার করে যাবো। মূলত যাদের একটি সাধারণমানের ডিজিটাল ক্যামেরা আছে তাদের জন্যই এই লেখা। সব ফোন ক্যামেরায় যদিও সব টিপস কাজে লাগানো যাবেনা, তারপরও কিছু কিছু কাজে লাগতে পারে।]

ভালো ছবির জন্য সাধারণ পালনীয় কিছু নিয়ম

১. মোড

অধিকাংশ ক্যামেরাতেই অনেকগুলো শুটিং মোড থাকে, যেমন: ইজি, অটো বা প্রোগ্রাম, শাটার প্রায়োরিটি, অ্যাপার্চার প্রায়োরিটি, ম্যানুয়াল। এছাড়াও বেশ কিছু প্রিসেট/সীন মোড থাকে, যেমন: Sunset, Beach, Snow, Foliage, Night, Fireworks, Pets, Sports ইত্যাদি। পরিস্থিতি বুঝে প্রিসেট মোডগুলো দিয়ে ছবি তুলতে পারেন, অনভিজ্ঞদের জন্য ভালোই ফলাফল দিয়ে থাকে। তবে আগেভাগেই নিজের ক্যামেরায় এই মোডগুলো নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করে হাত পাকিয়ে রাখুন, যাতে প্রয়োজনের সময় হঠাৎ খেই হারিয়ে না ফেলেন। শুটিং মোড-এর মধ্যে নতুনদের জন্য অটো বা প্রোগ্রাম মোড হলো সবচেয়ে নিরাপদ। একটু অভিজ্ঞ হলেই অন্য মোডে ছবি তোলা শুরু করুন - সেসব নিয়ে অন্যান্য পর্বে লিখবো।

২. জুম অপশন:

জুম দুরকমের - অপটিক্যাল ও ডিজিটাল। অপটিক্যাল জুমে ক্যামেরার লেন্সকে অ্যাডজাস্ট করে দূরের জিনিসকে কাছে দেখানো হয়; আর ডিজিটাল জুমে ক্যামেরার সফটওয়্যার দিয়ে ছবিকে বড়/ম্যাগনিফাই করা হয়। অপটিক্যাল জুম যখন এনগেজ হবে লেন্সের ভেতরের বিভিন্ন এলিমেন্টের অবস্থান পরিবর্তন হবে মেকানিক্যাল স্টেপার মোটরের সাহায্যে, এবং প্রায় সকল ক্যামেরাতেই সে সময় মোটরের ও লেন্সের নড়াচড়ার শব্দ শুনতে পাবেন; অনেক ক্যামেরাতেই ডিসপ্লেতে আপনাকে দেখাবেও কতটুকু জুম অর্জিত হলো (2x, 3x ইত্যাদি)। ক্যামেরার সর্বোচ্চ অপটিক্যাল জুম অর্জিত হবার পর আরো জুম করতে চাইলে ডিজিটাল জুম এনগেজ হয়, এবং ডিসপ্লেতে ডিজিটাল জুম যে এনগেজ হয়েছে সে রকম কোন চিহ্ন বা মেসেজ বা রংয়ের পরিবর্তন দেখতে পাবেন (ম্যানুয়াল দেখে নিশ্চিত হোন আপনার ক্যামেরার ক্ষেত্রে কি ধরনের ইন্ডিকেশন)। ডিজিটাল জুমের সময় লেন্স বা মোটরের কোন নড়াচড়া হবেনা, তাই কোন শব্দও শোনা যাবেনা। বেশিরভাগ মোবাইল হ্যান্ডসেটেই শুধুমাত্র ডিজিটাল জুম আছে, অপটিক্যাল জুম নেই।

জুম করার প্রয়োজন হলে শুধুমাত্র অপটিক্যাল জুম দিয়েই ছবি তুলবেন, ডিজিটাল জুম পারত ব্যবহার করবেন না। ডিজিটাল জুম মাত্রই আপনাকে নিম্নমানের ছবি দেবে। ছবিকে বড় করার দরকার হলে কম্পিউটারে ট্রান্সফার করার পর কোন ইমেজ এডিটিং সফটওয়্যার (যেমন ফটোশপ) দিয়ে বড় করবেন। ডিজিটাল জুম এনগেজ করলে এই একই কাজই ক্যামেরার বিল্ট-ইন সফটওয়্যার করে থাকে। কিন্তু ক্যামেরার সফটওয়্যারের চেয়ে কম্পিউটার সফটওয়্যারগুলো যেহেতু অনেক উন্নতমানের ও সফিসটিকেটেড অ্যালগরিদম ব্যবহার করে, কম্পিউটারে কাজটি করলে ক্যামেরার চেয়ে বেশ খানিকটা ভালো ফল পাওয়া যায়। নেহায়েতই কম্পিউটার সফটওয়্যার ব্যবহারে অপারগ হলে ডিজিটাল জুম ব্যবহার করবেন, অন্যথায় নয়। তবে খেয়াল রাখবেন, কম্পিউটারেই করুন আর ক্যামেরাতেই করুন, ডিজিটাল জুম সবসময়ই আপনার ছবির শার্পনেস কমিয়ে ফেলবে এবং ছবির মান খারাপ হয়ে যাবে। ব্যাক্তিগতভাবে আমি ডিজিটাল জুমকে নিজের জন্য নিষিদ্ধ জ্ঞান করি, এবং আমার ক্যামেরায় ডিজিটাল জুম পুরোপুরি বন্ধ করে রেখেছি যাতে বেখেয়ালেও কখনো ডিজিটাল জুম এনগেজ হয়ে না যায়।

৩. ছবির সাইজ

আপনার ক্যামেরাটি যত মেগাপিক্সেলেরই হোক সাধারণত কয়েকটি বিভিন্ন সাইজে ছবি তোলার সুযোগ তাতে দেয়া থাকবে। বড়র দিকে সর্বোচ্চ মেগাপিক্সেলে (Large), ছোটর দিকে সাধারণত ৬৪০x৪৮০ (Small বা ই-মেল সাইজ), এবং মাঝামাঝি আরো ২ বা ৩ টি সাইজ। পর্যাপ্ত স্টোরেজ/মেমোরী কার্ড থাকলে চেষ্টা করবেন বড়র দিকে ছবি তুলতে। কোন ছবিটি যে অসাধারণ হয়ে যাবে আপনি আগে থেকে জানেন না, একটি অসাধারণ ছবি ছোট সাইজে তুলে ফেলে পরে যেন না পস্তান সে জন্য বড় করেই ছবি তুলুন। বড় ছবি সবসময়ই আপনি ছোট করতে পারবেন শার্পনেসের কোন ব্যাঘাত না ঘটিয়েই, কিন্তু ছোট ছবি বড় করতে গেলেই তার মান কমে যাবে (ডিজিটাল জুম)। বড় করে ছবি তোলার আরেকটি সুবিধা হলো ছবির অংশবিশেষ কেটে নিলেও আপনার হাতে একটি বড় ইমেজ থাকবে।

৪. ছবির কোয়ালিটি

প্রায় সব ক্যামেরাতেই ছবির কোয়ালিটি কী রকম চান তা নির্ধারণের সুযোগ থাকে (ফাইনেস্ট বা বেস্ট কোয়ালিটি থেকে নিচের দিকে কোর্স বা লোয়েস্ট কোয়ালিটি, মাঝামাঝি আরো ১/২ টি ধাপ যেমন, অ্যাভারেজ)। আবারো পর্যাপ্ত স্টোরেজ/মেমোরী কার্ড থাকলে চেষ্টা করবেন সবসময় বেস্ট কোয়ালিটিতে ছবি তুলতে। পরে চাইলে আপনি কোয়ালিটি ডিগ্রেড করতে পারবেন, কিন্তু লো কোয়ালিটির ছবি আপগ্রেড করার সুযোগ নেই বললেই চলে।

৫. ফ্লাশ

যথাসম্ভব চেষ্টা করবেন ফ্লাশ ব্যবহার না করেই ছবি তুলতে, দিনের বেলায় আউটডোরে ফ্লাশের দরকার হয় না (কিছু বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া, পরে কখনো আলোচনা করবো)। কিন্তু ইনডোরে ফ্লাশ দরকার হয়ে পড়ে। ইনডোরে দরকার হলেও প্রথমে চেষ্টা করবেন ফ্লাশ ছাড়াই চালানো যায় কিনা, অর্থাৎ সব বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে, বাড়তি বাতির বা বাইরের আলো পর্যাপ্ত ঢোকার ব্যবস্থা করে। সেরকম ব্যবস্থা করা না গেলেই কেবল ফ্লাশ ব্যবহার করবেন। তবে খেয়াল রাখবেন স্থির নয় এমন সাবজেক্টের (যেমন শিশু বা প্রাণী) ইনডোর ছবি তোলার সময় ফ্লাশ ব্যবহার করাই যুক্তিযুক্ত। আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখবেন - বেশিরভাগ ক্যামেরারই বিল্ট-ইন ফ্লাশটির কার্যকরী দুরত্ব ১০-১২ হাতের বেশি নয়, এর চেয়ে দূরের জিনিস ফ্লাশ ব্যবহার করলেও ভালো ছবি আশা না করাই উচিত।

৬. ISO স্পীড:

ফিল্ম ক্যামেরায় স্পীড নির্ধারিত হয় ফিল্মের রাসায়নিক প্রলেপের আলোক-সংবেদনশীলতা দিয়ে, বিভিন্ন স্পীডের ফিল্ম পাওয়া যায়। ডিজিটাল ক্যামেরায় দরকার ছিলো না, তবু ফিল্মের যুগের সাথে মিল রাখার জন্য স্পীড ব্যবস্থাটি প্রবর্তন করা হয়েছে। সাধারণত স্পীড AUTO, 50, 100, 200, 400, 800, 1600, ... - এরকম হয়। যত বেশি স্পীডে ছবি তুলবেন, তত কম আলোতে ছবি তুলতে পারবেন, কিন্তু সেই সাথে ছবির মানও খারাপ হতে থাকবে (নয়েজ)। ৪০০র বেশি স্পীডে তোলা ছবি দেখলে আপনার মন খারাপই হতে পারে। AUTO স্পীডে থাকলে আলোর অবস্থা বুঝে ক্যামেরার সফটওয়্যারই সিদ্ধান্ত নেবে কত স্পীডে ছবিটি তুলতে হবে। চেষ্টা করবেন সবসময় যত কম ISO স্পীডে পারা যায় ছবি তুলতে, সবচেয়ে ভালো (কম সিগনাল-টু-নয়েজ রেশিও) ছবিটি সবচেয়ে কম ISO স্পীডেই পাওয়া যায়। আমার নিজের জন্য সর্বোচ্চ স্পীড ১০০, কদাচিত আলো খুব কম থাকলে ২০০ তে তুলেছি, তার উর্ধ্বে কখনোই নয়।

দ্র: ISO স্পীড আর শাটার স্পীড এক জিনিস নয়। শাটার স্পীড নিয়ে পরে লিখবো।

৭। এফেক্ট:

অনেক ক্যামেরাতেই বিভিন্ন রকমের এফেক্ট দিয়ে ছবি তোলার ব্যাবস্থা আছে, যেমন: সাদা কালো, সেপিয়া, নেগেটিভ, ফটো ফ্রেম ইত্যাদি। এসব ব্যবহার না করাই ভালো, কারণ ইচ্ছা করলেই ছবি কম্পিউটারে নিয়ে আপনি যে কোন এফেক্ট যোগ করতে পারবেন।

Read more

আমি বনফুল গো

Written by Sayedur R Chowdhury 1 comments Posted in:

অযত্নে অবহেলায় গজানো ঝোপজঙ্গলের গাছগাছালি আমাকে যত আকর্ষণ করে, যত্ন নিয়ে সারি করে লাগানো বাগানের গাছপালা কখনোই ততটা করে না। কেবলি মনে হয় সব মেকি। ফুলের ব্যাপারেও ঐ কথাই, নিজের জন্য ফুটে থাকা ফুল-ফলের মধ্যে যে বৈচিত্র, যে প্রাকৃতিক শৃঙ্খলা; বাগানে জ্যামিতিক প্যাটার্ন করে রংয়ের পালাবদল করে লাগানো ফুলে তার ছিটোফোঁটাও আমার নজরে পড়ে না।

সেদিন তাই আবার বেরুলাম জংলী ফুল-ফলের শোভা দেখতে। জংলী বলতে দূরে কোন জঙ্গলে নয়, আমারই আশপাশে, আমার হাটার ট্রেলটিতে। একটু সকাল সকালই বেরুলাম, তার ওপর বোরবার, তাই একেবারেই নিরিবিলি পেয়ে গেলাম।



ঘাসের সাথে ফুটে আছে আগাছা ফুল (সাদা ক্লোভার)


সাদা ক্লোভার - ছবিতে প্রায় ৪ গুণ বড় দেখাচ্ছে (ক্ষেত্রফল হিসাবে ১৬ গুণ)


এত ছোট ফুল তবু কারুকাজের কমতি নেই এতটুকু


লাল ক্লোভার


হলুদ মঞ্জরীর শোভা (কানাডিয়ান গোল্ডেন রড)


কানাডিয়ান গোল্ডেন রড - এ ফুলগুলো আরো ছোট, মাছিটির সমানই প্রায়


লেটকামার - গ্রীষ্ম অর্ধেক শেষ, এই ফুলের কলি হয়েছে কেবল (কানাডিয়ান থিসল)


কানাডিয়ান থিসল - একটি ফুটেছে, কেউ কেউ ফুটবো ফুটবো করছে


টাফটেড ভেচ - এই ফুলটিও ছবির অর্ধেকের কম হবে



সাদা সুইট ক্লোভার - এটি আগেরটিরও অর্ধেক হবে



ফক্সটেল বার্লী - এক রকমের ঘাসফুল



বাটারকাপ - এই ঝিঙ্গেমত ফুলটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে প্রায় ৩x৩ গুণ বড় করে


এই দুটো প্রায় ২x২ গুণ



ইন্ডিয়ান হেম্প - নাকফুলের মত এই ফুলটি আসলেই বড়সড় একটা নাকফুলের সমান হবে


কমন উড সরেল (কম আলো ছিলো বলে শার্প করতে পারিনি)


বার্ডফুট ট্রেফয়েল - অদ্ভুত সুন্দর এই ফুলটি খুব কম চোখে পড়েছে, ঘাসের পাশে বোঝা যাচ্ছে আকৃতিতে কতটুকু

আবারো বসন্ত দুয়ারে-০২ পোস্টে নিচের যে দুটি ফুলের ছবি দিয়েছিলাম. সেগুলোই এখন ফল হয়েছে
 










সীমের মত বুনো ফল, রোদ পড়লে সারাদিনই ঠাস ঠাস করে ফাটতে থাকে



আরেকটি ঘাসফুল


শিশিরভেজা ঘাসে খালি পায়ে হেটে বেড়াতে কার না ভালো লাগে? সুযোগ পেয়ে আমিও হেটে নিলাম

ফেসবুকে কানাডিয় বন্ধু ক্রিস্টার কমেন্ট পেয়ে জানতে চেয়েছিলাম, তোমাদেরও কি ভালো লাগে? সে জবাব দিয়েছে, "হম, হম... সত্যি বলতে আমি এভাবে ভাবিইনি কখনো..."



সাগরের চেয়ে বন-জঙ্গল পছন্দ করি এই সহজলভ্য প্রাণবৈচিত্রের জন্যই। এরকম বৈচিত্র সাগরে পেতে গেলে যেতে হবে গ্রেট ব্যারিয়ার রীফে, ডুব দিতে হবে ১০ থেকে ২০ মিটার গভীরতায়। অথচ কি অপার সৌন্দর্য্য আমার আশপাশেই ছড়িয়ে আছে জংলা ঝোপগুলোয়।

Read more


শক # ১৩

ভ্যাঙ্ক্যুভার বিমান বন্দর থেকে বেরিয়ে জীবনের প্রথম কানাডায় পা রাখলাম মাত্র। যাবো উইনিপেগ, তবে যাবার আগে ভিক্টোরিয়াতে একটা কনফারেন্সে যোগ দেবো। তাই ভ্যাঙ্ক্যুভার থেকে উইনিপেগের ডোমেস্টিক ফ্লাইট না ধরে বিমান বন্দরের বাইরে এলাম। উদ্দেশ্য ভিক্টোরিয়াগামী প্যাসিফিক কোচের বাস ধরবো। দেশ ছাড়ার আগেই ইন্টারনেটে পুরো রিসার্চ করে যাত্রা শুরু করেছি, তাই আমার কাছে জলের মত পরিষ্কার ভিক্টোরিয়া কিভাবে যেতে হয়। এমনকি ভিক্টোরিয়ায় হোটেল বুকিং, ৩দিন পর ভিক্টোরিয়া থেকে উইনিপেগের ফ্লাইট বুকিং সব দেশে থেকেই সেরে ফেলেছি। শুধু ভিক্টোরিয়া যাবার বাস টিকেটটি বিমানবন্দরের ভেতরে তাদের সেলস কাউন্টার থেকে কিনে নিলাম। এখন সামান্য অপেক্ষা প্যাসিফিক কোচের বাসটি বিমানবন্দর অ্যারাইভালের পিক-আপ জোনে এসে পৌঁছার। আমার সাথে দুটো হাতব্যাগ ছাড়াও ঢাউস সাইজের ৬৪ কেজি ওজনের দুটো লাগেজ। একটু পরেই আলিশান বাসটি এসে দাঁড়ালো সামনেই। দৈত্যাকৃতি ড্রাইভার নেমে আসতেই তাকে টিকেট দেখিয়ে জানালাম আমিও একজন প্যাসেঞ্জার। বললো, উঠে পড়ো। আমার বড় বড় লাগেজ দুটো দেখিয়ে দিতেই বললো, ট্যাগ লাগাও। আরে বাবা, নিজেকেই লাগাতে হয় নাকি! যাহোক পাশের পিক-ওয়ান বক্স থেকে ট্যাগ খুঁজে নিয়ে নাম লিখে পরিয়ে দিলাম হাতলে। বললাম, নাও আমার ব্যাগ। বাসের লাগেজ কম্পার্টমেন্ট খুলে দিয়ে সে বললো, লোড করো। আমারতো আক্কেল গুড়ুম, বলে কী! নিজেকেই ঐ খানে ঢুকে পড়ে লাগেজ তুলতে হবে বাসে? :O

শক # ১৪

আমার পাশেই অপেক্ষমান ছিলেন মাঝবয়সী এক মহিলা যাত্রী, কানাডিয়ই হবেন। তারও একটি হাতব্যাগ আর একটি লাগেজ। আমারগুলোর মত বড় নয়, মাঝারী মাপের স্যুটকেট। লাগেজ কম্পার্টমেন্টে নিজের লাগেজগুলো ঠিকঠাক সেট করে বেরিয়ে আসার মুখেই দেখলাম মহিলা নিজের লাগেজটি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন কম্পার্টমেন্টের মুখেই। জানি না কি বলা দরকার। তবু বলে ফেললাম, দাও তোমারটাও। মহিলা একটু যেন বিরক্তই হলেন। বললেন, ধন্যবাদ, আমি নিজেই আমারটা তুলবো। আমি বেরিয়ে আসার পর হামাগুড়ি দিয়ে মহিলা ঢুকে পড়লেন লাগেজ কম্পার্টমেন্টে। পরে ভিক্টোরয়াতে সেই কনফারেন্সেই মহিলার সাথে ভালো করে পরিচয় হলো। তিনি ইউনিভার্সিটি অব বৃটিশ কলাম্বিয়ার অধ্যাপক। সেদিনের দৃশ্যটি একবার ভাবলাম - বৃটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নারী অধ্যাপক হামাগুড়ি দিয়ে মাল টানছেন বাসের খুপরিতে। :O :O

শক # ১৫

ভিক্টোরিয়া ও ভ্যাঙ্ক্যুভার হলো কানাডার সবচেয়ে মৃদু আবহাওয়ার এলাকা। একদিকে প্রশান্ত মহাসাগর অন্যদিকে রকি মাউন্টেন এ এলাকাটিকে তীব্র শীত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। পীক উইন্টার জানুয়ারীর ১৫ তারিখে যখন ভিক্টোরিয়া ছাড়ছি তখন সেখানে তাপমাত্রা ১ ডিগ্রী, ঝিরঝির বৃষ্টিও হচ্ছিলো। এয়ার কানাডার ফ্লাইট না নিয়ে নিয়েছি ওয়েস্ট জেটের। এরা অনফ্লাইট অ্যানাউন্সমেন্টগুলোয় রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থাটির মতো অত ফর্মাল ভাষা ব্যবহার করে না। তাই ক্যাপ্টেন যখন ঘোষনা দিলো আমাদের গন্তব্য উইনিপেগে নামার
সময় তাপমাত্রা হবে শুন্যের নিচে সাতাশ, উত্তুরে বাতাসের কারণে অনুভূত হবে -৩৮ এর মতো, তার ভাষায় 'গেট ইওরসেল্ফ রেডী ফর আ বাট-কিকিং কোল্ড' (পশ্চাদ্দেশে লাথি খাওয়ার মত ঠান্ডার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করে নিন), তখনো এই বাট-কিকিং-এর মর্মার্থ আমার কাছে পরিষ্কার ছিলো না। ভয়ের চোটে চোখদুটো ছাড়া আর সব যখন আরো একপরত গরম কাপড় দিয়ে ঢাকছিলাম, এক সহযাত্রী হেসে বললো, "লুকস লাইক ইউ'র গনা টেক আ নর্দার্ন (মেরু) ট্রিপ, ডোন্ ওয়রী ম্যান, ইটস্ জাস্ট মাইনাস টুয়েন্টী সেভেন।" জাস্ট মাইনাস টুয়েন্টী সেভেন?! :O :O :O

পুরনো পর্বঃ
১. শক্‌ড অ্যাব্রোড-০১
২. শক্‌ড অ্যাব্রোড-০২
৩. শক্‌ড অ্যাব্রোড-০৩
৪. শক্‌ড অ্যাব্রোড-০৪

Read more